মনের খোড়াক গানের শুরুর ইতিহাস

চলার পথে মুগ্ধতার পারফিউম হচ্ছে গান । কেউ সঙ্গী নাহলেও গান সঙ্গী হয় । গান ভাল লাগে না এমন মানুষ খুব ই কম পাওয়া যাবে । চলুন জানি গানের অতীত:
প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের প্রসূতি । মানুষ প্রথম দিকে চার-পেয়ে জন্তু ছিলো । যে দিন সে দুই হাত উপরে তুলে গাছে ডাল ধরতে শিখে সেদিন থেকেই তাঁর হাত মুক্ত হয়ে যায় ।তার পর থেকে সে নিত্যনতুন জিনিসের বা উপকরনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শিখে । নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় সে তা পূরণ করতেও শিখে ।
শিকারে নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানে ভাষার প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হয়ে ওঠে । তারপর “হৈ-হৈ”, “পু-পু” বা যেকোনো তত্ত্বের বিচারেই হোক, মানুষ ভাষাকে করে নিয়েছে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অকৃত্রিম মিত্র হিসাবে ।সারাদিন শিকারের পিছনে দৌড়ে, ডেরায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে গাছের ফাঁপা গুঁড়ি বা বাঁশের চোঙায় ফুঁ দিয়ে সামান্য বিনোদনের ব্যাপারটি একসময় অনবদ্য প্রয়োজনীয় হয়ে ঊঠলো ।
আগুনকে ঘিরে উদ্দাম নাচ শৃঙ্খলায় না থাকলেও খুব শীঘ্রই তাঁরা পারস্পরিক ঐক্যকে গুরুত্ব দিয়ে সংঘবদ্ধ নাচকে প্রাধান্য দেয়া শুরু করে ।ফলে নাচ ওই গোষ্ঠীর একটা শিল্প, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গৌরবের পরিচয় হয়ে উঠে ।
আর গান?
পরস্পর অর্থহীন শব্দ, ইঙ্গিত বিনিময় এক সময় পূর্ণ অর্থে রূপ পায় । সে তখন চেষ্টা করে একে ফাঁপা গাছের গুঁড়ির সাথে তাল মেলানোর । তার সাথে যোগ করে দেয় সারাদিনের পশু শিকারের কাহিনী, বা মনের ইচ্ছা গুলোকে । গোত্র বা গোষ্ঠীর অভাব, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে আসা শুরু করে । তবে সুর, তাল, এবং সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে দিয়ে গানের জন্ম হয় আরও পরে । আগে মুখের ভাষা সুসংগঠিত হয়েছে । আদিম শিকারী সমাজে পশুর চামড়া দিয়ে তৈরী ঢোলে তালের সমন্বয় থাকলেও গানের নির্দিষ্ট কথা বা অর্থবোধক কথা দ্বারা গানের উদ্ভব আরো পরে । এগুলো ছিলো কোনো উৎসব বা শিকারে যাওয়ার আগে নিজেদেরকে একটু রাঙিয়ে নেয়া ।এই অর্থহীন সুর বা কথা গুলো বহু বছর পরে একেক জন সংগীতজ্ঞের হাতে পরে সুনিদির্ষ্ট কাঠামো লাভ করে । কিন্তু ততদিনে মানুষ অনেক উন্নত পর্যায়ে চলে এসেছে ।
অর্থাৎ লোকসংগীত থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীতের জন্ম হয়েছে । যেমন আগে ভাষা পরে ব্যাকরণ ! আমাদের বাংলা গানের উদ্ভবও তেমনি মনে করা যায়। আমরা আজকে যে রূপ দেখছি তা অনেক চড়াই-উৎরাই, ধাপ-প্রতিধাপ প্রভৃতি লেখচিত্র পেরিয়ে বিশ্ব সংস্কৃতির দরবারে জায়গা করে নিয়েছে । গানের ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও বাংলা সুসংবদ্ধ গানের ইতিহাস বেশি দিনের নয় । আবার একে আধুনিক হিসাবেও আখ্যা দেয়া যায় না ।
প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ (হিন্দুদের) “বেদ” এর দ্বিতীয় অংশ হলো “সাম” বা “সাম বেদ” । সংস্কৃত “সাম” শব্দের অর্থ হলো “সুরারোপিত শ্লোক” । এ গ্রন্থে শ্লোক গুলো আবৃত্তি না করে সুর করে গাওয়া হতো । আবার বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন “চর্যাপদ” থেকেও গানের নমুনা পাওয়া যায় । কেননা “চর্যাপদ” হলো “চর্যাপদ গীতিকা” বা গানের সমাহার। বৌদ্ধ পন্ডিতেরা তা সুর সহকারে গাইতেন এবং প্রতিটি শ্লোকের উপর রাগ বা রাগিনীর নাম লেখা থাকতো । এ গুলোর মোট সংখ্যা উনিশ এবং যদি “শবরী” ও “শীবড়ী”, “গোবড়া” ও “গৌড়া” কে একটি বিবেচনা করা যায় তাহলে সতেরোটি । আবার “চর্যাপদ” এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাগ হলো “পটমঞ্জরী” । অন্যান্য রাগের মধ্যে “মালসী”, “মল্লারী”, “রামক্রী”, “কামোদ”, “বরাড়ী”, “বঙ্গাল”, “গবড়া” উল্লেখযোগ্য । এগুলো আর্য এবং স্থানীয় সুরের মিশ্রনে তৈরী হয়েছিলো ।বঙ্গদেশ ভারতবর্ষের এক প্রান্তে অবস্থিত । এখানে অনুপ্রবেশকারী আর্যরা তাদের সংস্কৃতির নিজস্ব সুর অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেনি । তার সঙ্গে বঙ্গীয় আঞ্চলিক সুরের ব্যাপক মিশ্রণ হয়েছিলো বলে মনে করা হয় । কেননা তখনকার রাগিনীর মধ্যে গৌড়-মল্লার, গৌড়-সারঙ্গ তাই ইঙ্গিত করে থাকে
বাংলা গানের ইতিহাস , বাংলা ভাষার ইতিহাসের মতোই হাজার বছরের পুরোনো । বস্তুত চর্যাপদ যাকে বলা হয় সে তো উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতেরই আদি রূপ। এই চর্যাপদের সুরারোপিত পরিবেশনা , বাংলা গানে নিয়ে আসলো এক ধরণের ধ্রুপদ শৃঙ্খলা। ১২ শতকে লেখা জয়দেবের গীতগোবিন্দ বোধ করি ধ্রুপদাঙ্গের গানের প্রথম ও প্রায়োগিক সূচনা।
আবার বৌদ্ধদের চর্যাগীতির অনুগামি হয়েছে বাংলা গান। ১৬৮৭ সালে ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত , তখন রাজশাহীর নরোত্তম ঠাকুর পদাবলী কীর্তনকে দিলেন এক নতুন রূপ। আর এ ক্ষেত্রে ভারতচন্দ্রের নাম উল্লেখ করা যায় যিনি সঙ্গীতকে নিয়ে আসলেন মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে।অথচ বাংলা গানের এই আধুনিক যুগ সুবিস্তৃত। এর প্রধান পুরুষ রামনিধি গুপ্ত বা নিধু বাবু , যার টপ্পা সেই ১৯০৭ সালে আধুনিক গান বলে বিবেচিত হয়েছে এবং তারই পাশাপাশি যদি আমরা ১৯৯২ সালে বাণীবদ্ধ কবীর সুমনের গান শুনি , তা হলেই বোঝা যাবে , গানের সুরে ও কথায় বিস্তর ফারাক । লক্ষ্য করার বিষয় নিধু বাবুর প্রেম যেন অত্যন্ত ভীরু , সঙ্কুচিত খানিকটা , অনুগত সে প্রেয়সীর প্রতি। আর সুমনের গানে প্রেম যেন রাজনীতির সুরে লয়ে বাঁধা, ঝাঁঝালো শ্লোগানে পরিপূর্ণ । রোমান্টিকতার এক ভিন্ন প্রকাশ । এ সব নিয়েই বাংলা গানের এই সঙ্কলন ।
বাংলা সংগীত বাংলার সহস্রাব্দ প্রাচীনধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সাংগীতিক ঐতিহ্যটিকে নির্দেশ করে। ঐতিহাসিক বাংলা অঞ্চলটি বর্তমানে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিভক্ত। বাংলা ভাষায় রচিত ও বিভিন্ন শৈলীর সুরে সমৃদ্ধ বাংলা সংগীত ধারাটি এই উভয় অঞ্চলেই ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী।প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সংগীত সম্পাদনা বাংলার প্রাচীন সংগীতকলা সংস্কৃত স্তোত্রসঙ্গীত প্রভাবিত। এই সময়কার বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত কিছু ধর্ম সংগীতিগুলি আজও পূর্ব ভারতীয় মন্দিরগুলিতে গীত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দম্ এই জাতীয় সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। মধ্যযুগে নবাব ওবারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত শক্তিশালী ভূস্বামীবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিপালিত সংগীতধারায় আবার হিন্দু ও মুসলমান সাংগীতিক রীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গানগুলির অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় সংগীত। মধ্যযুগের প্রথম পাদে বিদ্যাপতি,চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, ও বলরামদাসপ্রমুখ বৈষ্ণব পদকর্তাগণ রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গানে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমচেতনার একটি পার্থক্য দর্শিয়েছেন। আবার মধ্যযুগের শেষ পাদেরামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ শাক্তপদাবলিকারগণ তাঁদের গানে ঈশ্বরকে শুদ্ধ মাতৃরূপে বন্দনার কথা বলেছেন। বৈষ্ণব ওশাক্তপদাবলি (শ্যামাসংগীত ও উমাসংগীত) উভয়েরই মূল উপজীব্য হিন্দু ভক্তিবাদী দর্শন। বৈষ্ণব সংগীতে যখন জীবাত্মা-পরমাত্মাকেন্দ্রিক প্রেমভক্তির তত্ত্ব প্রচারিত হয়, তখনই শাক্তগানেতন্ত্র ও শুদ্ধা মাতৃবন্দনার এক সম্মিলন গড়ে ওঠে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন